রবিবার, জানুয়ারি ২৬, ২০২০
Home > আন্তর্জাতিক > তেলেঙ্গানার পর উত্তাল উন্নাও

তেলেঙ্গানার পর উত্তাল উন্নাও

আন্তর্জাতিক ডেস্ক ॥
তেলেঙ্গানার পর এবার উত্তাল হয়ে উঠেছে উন্নাও। ভারতের উত্তরপ্রদেশে ধর্ষণ মামলার শুনানিতে যাওয়ার পথে অভিযুক্ত ধর্ষকদের দেয়া আগুনে দগ্ধ উন্নাওয়ের তরুণী মারা গেছে।

৯০ শতাংশ দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে ২৩ বছরের ওই নারীর মৃত্যুর পর ক্ষোভে, প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে উন্নাও। বিধানসভা ভবনের সামনে শনিবার সকাল থেকেই ধরনায় বসেছেন উত্তরপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী সমাজবাদী পার্টি (সপা) নেতা অখিলেশ সিং যাদব।

ধরনা শুরুর আগে তরুণীর প্রতি সহমর্মিতা জানাতে দুই মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। সকালেই ধর্ষিতার বাড়িতে গিয়ে স্বজনদের সান্ত্বনা দেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াংকা গান্ধী।

প্রবল চাপে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গণধর্ষণ মামলাটিকে সরিয়ে ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্টে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আশ্বাস দিয়েছেন, ‘অপরাধীরা কঠোরতম শাস্তি পাবে।’

এনডিটিভি বলছে, শুক্রবার রাতে দিল্লির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় ওই তরুণীর। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকেই তাকে বিমানে করে দিল্লির সফদারজং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

মৃত্যুর আগে পুলিশকে ওই তরুণী তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া ৫ জনেরই নাম বলে যান। উন্নাওয়ের এ নারী মার্চে শিভম ত্রিবেদী ও শুভম ত্রিবেদী নামে দু’জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন।

এর ভিত্তিতে পুলিশ শিভমকে আটক করলেও শুভম ছিল পলাতক। বুধবার আদালতে যাওয়ার পথে তরুণীকে পুড়িয়ে মারার চেষ্টার মাত্র ৫ দিন আগে শিভম জামিনে ছাড়া পেয়েছিল। পুলিশ বৃহস্পতিবারই ৫ জনকেই গ্রেফতার করে। গণধর্ষিতার জন্য কেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হল না, সেই প্রশ্নটা উঠতে শুরু করেছে। এ দিন উন্নাওয়ে পৌঁছেই প্রিয়াংকা বলেন, যারা প্রথমে এফআইআর নিতে অস্বীকার করেছিলেন সেই পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে যোগী আদিত্যনাথের সরকার কেন এখনও কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি? রাজ্য সরকারের কড়া সমালোচনা করেন প্রিয়াংকা।

তার প্রশ্ন, ‘উন্নাওয়ে এর আগেও এমন ঘটনা (ধর্ষণ) ঘটেছে। তার পরেও কেন রাজ্য সরকার সতর্ক হল না। আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার পথে কেন প্রাণ হারাতে হল তাকে ?’ ধর্নামঞ্চ থেকেই সপা নেতা অখিলেশ সিং যাদব জানিয়েছেন, দু’-একদিনের মধ্যেই তিনি যাবেন ধর্ষিতার বাড়িতে।

তার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলবেন। সঙ্গে তার দলের অন্য নেতারাও যাবেন বলে জানিয়েছেন অখিলেশ। ধর্নামঞ্চে অখিলেশের সঙ্গী হয়েছেন প্রবীণ সপা নেতা রাজেন্দ্র চৌধুরী ও দলের রাজ্য শাখার প্রধান নরেশ উত্তম প্যাটেল।

এদিকে উন্নাওয়ের ধর্ষিতার গ্রামে এসে বিক্ষোভের মুখে পড়লেন উত্তরপ্রদেশের মন্ত্রীরা। ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী যোগী তার মন্ত্রিসভার দু’জন মন্ত্রী কমল রানী বরুণ এবং স্বামী প্রসাদ মৌর্যকে উন্নাওয়ের গ্রামে গিয়ে নিগৃহীতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দেন। মন্ত্রীদের গাড়ি গ্রামে প্রবেশ করার পরেই সেই গাড়ি ঘিরে ধরে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন স্থানীয়রা। প্রশ্ন তোলেন, ‘এখন কেন?’

উন্নাও ধর্ষকদেরও ক্রসফায়ার চান ধর্ষিতার বাবা

তেলেঙ্গানার মতোই তার মেয়ের ধর্ষকদেরও গুলি করে মারা হোক বলে শনিবার দাবি জানিয়েছেন উন্নাওয়ে ধর্ষিতার বাবা। বলেছেন, ‘আমার মেয়েকে হারিয়েছি। যারা ওকে মারল, তাদেরও গুলি করে মারা হোক বা ফাঁসিতে ঝুলানো হোক।’ একই দাবি উন্নাওয়ে গণধর্ষিতার ভাইয়েরও, ‘আমার বোনকে ওরা যেখানে পাঠিয়েছে, আমি চাই, ওদেরকেও সেখানে পাঠানো হোক। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আমি এই আর্জি জানাচ্ছি।’

আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাওয়ার পথে বুধবার ২৩ বছরের ওই তরুণীর গায়ে আগুন দেয় ধর্ষকরা। শুক্রবার রাত পৌনে ১১টায় হাসপাতালে মৃত্যু হয় তার। ময়নাতদন্তের জন্য তার দেহটি পাঠানো হয়েছে হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগে।

সেখান থেকে দেহ তুলে দেয়া হবে তার পরিবারের হাতে। তরুণীর ভাই বলেন, ‘আমি চাই, আমার বোনকে ওরা যেখানে পাঠিয়েছে, ওদেরকেও সেখানে পাঠানো হোক। আমি মোটেই চাই না, ওই পাঁচজন বেঁচে থাকুক। হয় ওদের গুলি করে মারা হোক। না হলে ফাঁসিতে লটকানো হোক। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের কাছে আমি এই আর্জি জানাচ্ছি। ধর্ষণের ঘটনার পর ওকে বাঁচাতে বলেছিল বোন। আমি ওকে বাঁচাতে পারলাম না।’

তেলেঙ্গানায় এক পশু চিকিৎসককে দলবেঁধে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনায় গ্রেফতার চারজনকে ‘এনকাউন্টারে’ হত্যা করেছে পুলিশ।

তেলেঙ্গানায় ধর্ষণে অভিযুক্ত চারজনের লাশ সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন রাজ্যের হাইকোর্ট। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের লাশের ময়নাতদন্তের ভিডিও রেকর্ড করে শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে ওই রেকর্ডিং রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

ধর্ষণের রাজধানী হয়ে উঠেছে এই শহর

ভারতের উত্তরপ্রদেশের উন্নাও শহর ‘ধর্ষণের রাজধানী’তে পরিণত হয়েছে। ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৮৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে যোগী রাজ্যের এ শহরে। এছাড়া ২০০-র কাছাকাছি যৌন হেনস্থাও ঘটেছে একই বছরে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, এগুলো কেবল নথিভুক্ত হওয়া তথ্য। এর বাইরে নথিভুক্ত না হওয়া দৈনিক এমন নানা ধর্ষণ আর হেনস্থা জুড়লে সংখ্যাটা আরও বড় হবে বলে জানিয়েছে এনডিটিভি। উন্নাওয়ের জনসংখ্যা প্রায় ৩১ লাখ।

লক্ষ্ণৌ থেকে প্রায় ৬৩ কিলোমিটার এবং কানপুর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শহরটি। প্রতিবেদন অনুসারে, একই সময়ে এ জেলা থেকে মহিলাদের যৌন হেনস্থার ১৮৫টি ঘটনার বিষয়ে অভিযোগ দায়ের হয়েছে।

উন্নাওয়ের আসোহা, আজগাইন, মাখি এবং বাঙ্গারমাউয়ে ধর্ষণ ও শ্লীলতাহানির বিভিন্ন অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিযুক্তরা হয় প্রথমে গ্রেফতার হয়ে পরে জামিনে মুক্তি পেয়েছে বা পালিয়ে গেছে।

স্থানীয় মানুষ এ পরিস্থিতির জন্য পুলিশকে দোষারোপ করেছে। আজগাইনের বাসিন্দা রাঘব রাম শুক্লা বলেন, ‘উন্নাওয়ের পুলিশ পুরোপুরি রাজনীতির পুতুলে পরিণত হয়েছে। ওপর মহলের রাজনৈতিক কর্তাদের অনুমতি না পেলে তারা এক ইঞ্চিও নড়বে না। এই মনোভাব অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে।’

স্থানীয় একজন আইনজীবী বলেন, ‘এখানে অপরাধকে কেন্দ্র করে রাজনীতি চলছে। রাজনীতিবিদরা এখানে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বুঝে নিতে অপরাধকে ব্যবহার করছে। পুলিশ তাদের হাতের পুতুল হয়ে রয়েছে।

সাম্প্রতিককালে যখন নতুন শহর গড়ার জন্য জমি অধিগ্রহণ নিয়ে কৃষকরা হিংসার মুখে পড়েছিল, পুলিশ তখন নিজের পিঠ বাঁচিয়েছে।