শুক্রবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৯
Home > জাতীয় > মুক্তিযোদ্ধা খোকাকে সর্বস্তরের শ্রদ্ধা

মুক্তিযোদ্ধা খোকাকে সর্বস্তরের শ্রদ্ধা

বাংলাভূমি ডেস্ক ॥
বীর মুক্তিযোদ্ধা বিএনপির ভাইস চেয়াম্যান সাদেক হোসেন খোকা সর্বস্তরের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। এই বীর সেনানীকে ফুলেল শ্রদ্ধা জানান রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতৃবৃন্দ।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার লাশবাহী কফিন বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেয়া হয়।

শহীদ মিনারে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ মুক্তিযোদ্ধা খোকার মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দসহ অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরাও পুষ্প অর্পণের মাধ্যমে প্রিয় নেতাকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এ সময় প্রয়াত বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার বড় ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন বলেন, আমার বাবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়েও দেশের মাটিতে মরতে পারেননি। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে স্বাধীন করা দেশে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করতে পারেননি তিনি।

প্রকৌশলী ইশরাক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এখনই দূর করা প্রয়োজন। আমাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বেগম খালেদা জিয়া যে প্রতিহিংসার কারণে কারাগারে রয়েছেন তা সমাধান করার জন্যও প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন তিনি।

এর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোকার দ্বিতীয় জানাজার আগে আবেগঘন বক্তৃতা দিয়েছেন তার বড় ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। বাবার স্মৃতি রোমন্থন করে ইশরাক বলেন, প্রায় সময়ই আব্বু বলতেন- ‘যেই বাংলাদেশ নিজ হাতে স্বাধীন করেছি, সেই দেশে আমাকে কি বাক্সবন্দি হয়ে ফিরতে হবে…।’ শেষ পর্যন্ত বাবার কথাই সত্যি হলো। তাকে দেশে আনা হলো, তবে সুস্থ অবস্থায় নয়, একেবারে কফিনে মুড়িয়ে বাক্সবন্দি করে। এ কথা বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন খোকার ছেলে ইশরাক।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকাকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন- গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি মুক্তিযোদ্ধা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জেএসডি সভাপতি আসম আবদুর রব, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, জাসদের নাজমুল হক প্রধান, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, এলডিপির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ, গণফোরাম নেতা আবু সাঈদ, বীর প্রতীক হাবিবুল আলম, শিল্পী ফকির আলমগীর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাদা দল, ভাসানী অনুসারী পরিষদ, গণতান্ত্রিক বাম জোট, স্বাধীনতা ফোরাম, মুক্তিযোদ্ধা দলের উলফাক ও সাদেক খান, জাতীয় হিন্দু মহাজোট, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি অনিক রায় ও মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দল।

শ্রদ্ধা জানানোর পর লাশ নিয়ে যাওয়া হয় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। সেখানে বাদ জোহর সাদেক হোসেন খোকার তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। দুপুর ৩টায় ৪র্থ জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভবনে। পরে বাদ আসর গোপীবাগ নিজ বাসা হয়ে ধূপখোলা মাঠে পঞ্চম জানাজা নামাজ শেষে জুরাইন গোরস্তানে দাফন করা হবে।

এর আগে বেলা ১১টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় খোকার মরদেহবাহী গাড়িটি পৌঁছায়। পরে দক্ষিণ প্লাজায় অস্থায়ীভাবে স্থাপিত মঞ্চে মরদেহের কফিনটি রাখা হয়। সেখানে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজার আগে বাবার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া চান বড় ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাতীয় পার্টির মহাসচিব হয়েছেন মশিউর আলম রাঙ্গা, জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ, এলডিপির মহাসচিব ড. রেদওয়ান আহমেদ খোকার জানাজায় উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপি নেতাদের মধ্যে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, জমিরউদ্দিন সরকার, এর মোরশেদ খান, আবদুল্লাহ আল নোমান, জয়নুল আবদীন, ফজলুল হক মিলন প্রমুখ জানাজায় অংশ নেন।

এর আগে সাদেক হোসেন খোকার লাশ আজ সকাল ৮টা ২৮ মিনিটে রাজধানীর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে।

খোকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু তার মরদেহ গ্রহণ করেন। বিমানবন্দর থেকে খোকার মরদেহ জাতীয় সংসদ ভবনে নেয়া হয়। লাশবাহী গাড়িতে ছিলেন মির্জা আব্বাস।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার প্রথম জানাজা জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জানাজায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত সর্বস্তরের বাংলাদেশিরা অংশ নিয়েছেন। জানাজা শেষে তাকে গার্ড অব অনার দেয়া হয়।

বাংলাদেশ সময় বুধবার সকালে সাদেক হোসেন খোকার মরদেহ নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয় তার পরিবার।

সাদেক হোসেন খোকা সোমবার বেলা ১টা ৫০ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মারা যান। ক্যান্সারে আক্রান্ত খোকা প্রায় পাঁচ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ছিলেন।

সবশেষ ১৮ অক্টোবর নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের মেমোরিয়াল স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যান্সার সেন্টারে ভর্তি হন খোকা। গত সোমবার তার শ্বাসনালি থেকে টিউমার অপসারণ করা হয়। নিউইয়র্ক সময় রাত ২টা ৫০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় সোমবার বেলা ১টা ৫০ মিনিটে) তার মৃত্যু হয়।

১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালে সাদেক হোসেন খোকা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন একজন গেরিলা যোদ্ধা। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথম সাদেক হোসেন খোকা বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত হন। তার দল সরকার গঠন করলে তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও তিনি সাংসদ নির্বাচিত হন। পরে তাকে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী করা হয়। ২০০১ সালে তার দল সরকার গঠন করলে তিনি মৎস্য ও পশুসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব লাভ করেন। ২০০২ সালে তিনি অবিভক্ত ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হন।

মৃত্যুর আগে বারবার দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছিলেন খোকা। সবশেষ হাসপাতালে ভর্তির আগে বন্ধু বিএনপি নেতা ইকবাল হাসান টুকুকে টেলিফোনে বলেছিলেন, জীবনবাজি রেখে যে দেশ স্বাধীন করেছিলাম, সে দেশের মাটিতে ফিরতে পাব কিনা আল্লাহ জানেন।